জামালপুরের আকরাম : সিদ্ধ ডিম বিক্রেতা থেকে শত কোটি টাকার মালিক

তার বাহিনীর তাণ্ডবের বিচার পায় না এলাকাবাসী

জামালপুরের আকরাম হোসেন সামান্য সিদ্ধ ডিম বিক্রেতা থেকে এখন শত কোটি টাকার মালিক। অজ্ঞাত অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে সে গড়ে তুলেছে সন্ত্রাসী বাহিনী। আর এই বাহিনী দিয়ে গত কয়েক বছর ধরে সন্ত্রাসী কায়দায় তাণ্ডব চালিয়ে আসছে গ্রামের নিরীহ মানুষের উপর।

তার এই তাণ্ডব থেকে রেহাই পাচ্ছে না বৃদ্ধ থেকে শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও। আকরাম বাহিনীর অব্যাহত তাণ্ডবে গ্রামের সহজসরল মানুষগুলো অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও কালো টাকার প্রভাবের কারণে কেউ বিচার পাচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

গতি দুদিনে জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের ঢেংগারগড়ে সরেজমিনে গিয়ে পাওয়া যায় এমন তথ্য।

স্থানীয়রা জানান, ঢেংগারগড় এলাকার নছর আলীর ছেলে আকরাম হোসেন (৪০)। অক্ষর জ্ঞানহীন আকরাম হোসেন একসময় ঢেংগারগড় বাজারে ডিম সিদ্ধ করে বিক্রি করতো। অভাব-অনটনের সংসারে বাধ্য হয়েই জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমায় বন্দর নগরী চট্টগ্রামে। সেখানে গিয়ে জাহাজ ভাঙার শ্রমিকের কাজ শুরু করে।

এলাকাবাসী বলছেন, জাহাজের ভাঙা টুকরা যেন আলাদিনের চেরাগে পরিণত হয় আকরামের কাছে। হঠাৎ করেই রাতারাতি কোটিপতি বনে যায় সে। চট্টগ্রামের স্থানীয় একজন মহিলাকে বিয়েও করে। এর পর থেকেই ডিম বিক্রেতা আকরাম থেকে হয়ে যায় বিত্তশালী আকরাম। এলাকায় তার প্রভাব বিস্তারের জন্য গড়ে তুলে নিজস্ব বাহিনী। অবৈধ অর্থ ব্যবহার করে এই বাহিনী দিয়ে মানুষের জমি দখল, তার কথা অবাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের শায়েস্তা করতে সন্ত্রাসী কায়দায় মারপিট, বাড়ি-ঘরে তান্ডব চালিয়ে ভাঙচুরসহ এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে সে জানান দেয় তার প্রভাব। গত ৩ বছরে আকরাম বাহিনীর হাতে অন্তত: ১০ জন ব্যাক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন। আকরাম বাহিনীর সন্ত্রাসী হামলার শিকার ভুক্তভোগীরা আজও কোন বিচার পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় লোকজন বলেন, নড়বড়ে টিনের ঘরের বাসিন্দা আকরাম হোসেন ৫ বছর আগে নিজ এলাকা ঢেংগারগড়ে গড়ে তুলেছে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি। বাড়ি নির্মানের পর থেকেই এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। গড়ে তুলে নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। জমি দখল, অসহায়দের উপর অত্যাচার, সালিশ বাণিজ্য ও তার বিরুদ্ধে কথা বললে শারীরিকভাবে নির্যাতনসহ আকরামের সন্ত্রাসী বাহিনীর আরো নানা অপকর্মের মাধ্যমে অতিষ্ঠ করে তুলে এলাকাবাসীদের।

শরিফপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. শামীম হোসেন বলেন, আকরাম চট্টগ্রাম গিয়েছিলো দিনমজুরের কাজ করতে। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার পর থেকে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে এলাকায় অপকর্ম করে সে । প্রতি বছরই তার জন্য এলাকায় বড় ধরনের মারামারি-হানাহানির ঘটনা ঘটে। এখনো তার বিরুদ্ধ কয়েকটি মামলা রয়েছে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ গোদাশিমলার চান নায়েব, হামিদপুরের আল আমিন,মমতা, লাইলী, লুৎফাকে মারধর করেছে আকরামের সন্ত্রাসী বাহিনী। আমরা এই আকরামের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।

গোদাশিমলা বাজারের ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আকরামের সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পান না। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই হামলা-মামলার শিকার হতে হয়। গ্রামে তার অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কয়েকবার মানববন্ধনও হয়েছে। কিন্তু আমরা কোন প্রতিকার পাইনি। আমরা এই আকরামের সন্ত্রাসী বাহিনী কবল থেকে মুক্তি চাই।

শ্যামপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেন বলেন, এমন কোনো অপকর্ম নেই যা আকরাম করে না। জমি দখল, সালিশ বাণিজ্য, মাদক সেবনসহ সবধরনের অপকর্মে লিপ্ত আকরাম। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি আমরা। টিনের ঘরে থাকা আকরাম এখন কয়েক কোটি টাকার বাড়িতে থাকে। আমরা এই এলাকায় তাকে আর দেখতে চাই না।

ঢেংগারগড় এলাকার মুরাদ হোসেন বলেন, কেউ কোনোদিন বৈধভাবে রাতারাতি কোটিপতি হতে পারে না। আকরাম হোসেন অবৈধভাবেই কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। এখন আমাদের এলাকার লোকদের উপর নির্মম নির্যাতন করছে। আমরা এই আকরাম বাহিনী থেকে মুক্তি চাই। আমরা চাই, দুদক তার অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করুক এবং তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করুক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেন, মাদক কারবারের সাথে আকরামের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তা না হলে রাতারাতি কোন ব্যক্তি শত কোটি টাকার মালিক হতে পারে না । বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এসব সচেতন ব্যক্তিরা।

অপরদিকে বেশ ক’জন ভুক্তভোগী বলেন, আকরামের সাথে পুলিশ ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আকরাম ও তার বাহিনী সাধারণ মানুষকে নানাভাবে ক্ষতি ও হয়রানি করে আসলেও তারা কোন বিচার পাচ্ছে না।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারন সম্পাদক ও মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, তার অতীতের যে অবস্থা ছিলো আর বর্তমানে যেভাবে ফুলে-ফেপে বটগাছ হয়ে গেছে তা আসলেই রহস্যজনক। আমি দুদককে এই বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করার জন্য অনুরোধ করছি।

এসব বিষয়ে আকরাম হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, আমি এলাকায় মাদক, জুয়া ও সুদের ব্যবসা বন্ধ করেছি। এ জন্য এলাকার একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে এসব গুজব ছড়াচ্ছে। আমি চট্টগ্রামের একজন ঠিকাদার। আমরা সব সম্পদের হিসাব রয়েছে। একটি পক্ষ ঈর্ষান্বিত হয়ে অপপ্রচার করছে।

dailykagojkolom.com এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।