রাজনৈতিক বিভাজন সত্বেও সাংবাদিকদের পেশাগত সহমর্মিতা বাঞ্চনীয়

|| শিতাংশু গুহ ||

২৭ ডিসেম্বর ২০২১, নিউইয়র্ক। সাংবাদিক রিয়াজুদ্দিন আহমদ মারা গেছেন। মিডিয়ায় সংবাদটি দেখে দু:খ পেয়েছি। তাঁর আত্মা শান্তিতে থাক। রিয়াজভাই’র মৃত্যু সংবাদটি কিভাবে লিখবো তা নিয়ে ক্ষণিক ইতস্তত: করলাম, ভাবলাম কি লিখবো, তিনি কি ইন্তেকাল করেছেন, না মারা গেছেন, বা আর নেই, বা ইহলোক ত্যাগ করেছেন, পরলোকে গমন করেছেন, লোকান্তরিত হয়েছেন, বা মহাপ্রস্থান করেছেন বা চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন, ইত্যাদি’র কোনটি? বাংলাদেশী মিডিয়ায় নিশ্চয় তিনি বিভিন্নভাবে শিরোনাম হয়েছেন।

সত্তর দশকের একেবারে শেষে বা আশির দশকের শুরুতে একদিন দৈনিক সংবাদের নিউজ এডিটর আব্দুল আওয়াল খাঁন শিফট-ইন-চার্জ মোজাম্মেল হোসেন মন্টুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মন্টু, মানুষ মারা গেলে তোমরা কিভাবে বিভিন্ন শিরোপা দাও’? বলা বাহুল্য, মন্টু-ভাই’র কাছে এর কোন উত্তর ছিলোনা। সেদিন বা আজো আমার মনে হয়, হেডিংটি যিনি করেন তিনি মৃতের সামাজিক বা বৈশ্বিক অবস্থান থেকেই তা করেন। যেমন একজন মৌলানা মারা গেলে লেখা হয়, ‘ইন্তেকাল’ করেছেন বা উত্তম কুমার মারা গেলে লেখা হয়, ‘মহাপ্রস্থান’ করেছেন।

১৯৮৮ সালে ডিইউজে ছেড়ে আমি ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নে ট্রেজারার পদে নির্বাচন করি। ইকবাল সোবহান চৌধুরী সভাপতি পদপ্রার্থী। উল্টোদিকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রিয়াজুদ্দিন আহমদ। তখন পুরো দেশে ভোট ছিলো মাত্র ১১৯টি। ইকবাল সোবহান চৌধুরীর নেতৃত্বে আমরা প্রায় সারাদেশ ঘুড়ি। নির্বাচনের আগের দিন বিকালে প্রেসক্লাবে আমার প্রতিদ্ধন্ধির সাথে দাবা খেলি, আমি জিতি। প্রতিদ্ধন্ধী বলেন, ‘শিতাংশু, খেলায় আপনি জিতলেন, কাল নির্বাচনে আমি জিতবো’। অফিসে যাওয়ার আগে সন্ধ্যায় রিয়াজভাই প্রেসক্লাবের গেটে আমায় থামালেন, বললেন, ‘শিতাংশু, অনেক খেটেছেন, তবে জিতবেন না? তাই হয়েছিলো, আমরা ৫-৭ভোটের ব্যবধানে প্রায় সবাই হেরেছিলাম।

সাংবাদিকদের মধ্যে দলাদলি তখনো এতটা ‘অ-সুন্দর’ ছিলোনা। সবাই সবার সাথে কথা বলতো, একসাথে আড্ডা দিতো। রিয়াজুদ্দিন আহমদ উল্টো প্যানেলের হলেও সবাই তাকে সন্মান করতো। তখন রাজনৈতিক দলের মতো সাংবাদিকরাও প্যানেল বদলাতো? একদা গিয়াস কামাল চৌধুরী আমাদের নেতা ছিলেন, পরবর্তীতে তিনি অন্য শিবিরে পাকাপোক্ত হয়ে যান। আবেদ খান আমাদের নেতা, একবার তিনি উল্টো প্যানেলে ডিইউজে সভাপতি প্রার্থী হ’ন। নির্বাচনী সভায় অন্যদের সাথে তাঁকে আচ্ছামত ‘ধোলাই’ দিই, সেদিন তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘শিতাংশু, এমনভাবে বলতে পারলেন’? আবেদভাই, এখনো আমার শ্রদ্ধেয়, এসব দৃষ্টান্ত দেয়ার কারণ হলো,  তখনো প্যানেল বা রাজনীতি ভিন্ন হলেও আমাদের মধ্যে এতটা তিক্ততা ছিলোনা।

রিয়াজুদ্দিন আহমদ একবার নিউইয়র্ক এলেন। আমি তখন নিউইয়র্কে। দৈনিক বাংলার মন্জুর আহমদের জ্যাকসন হাইটসের বাসায় তাঁর সাথে দেখা করলাম। প্রেসক্লাবে তখন রিয়াজভাইরা ক্ষমতাসীন এবং শুনলাম আমাদের সদস্যপদ ‘খারিজ’ হয়ে গেছে? দৈনিক সংবাদের নাসিমুন্নাহার নিনি’ও সম্ভবত: সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বললাম, ‘রিয়াজভাই, একবার প্রেসক্লাবে সদস্য হলে তো সেটা খারিজ করা যায়না, আপনারা কিভাবে আমাদের সদস্যপদ খারিজ করলেন’? রিয়াজভাই সবদিক ব্যাখ্যা করে বললেন, আমরা আপনাদের সদস্যপদ খাইনি, স্থগিত করে রেখেছি, যখনি দেশে যাবেন, আবার আপনাদের সদস্যপদ ফিরে পাবেন। ঘটনা তা-ই।

আশির দশকের একটা সময় সাংবাদিক নেতারা অনেকেই ছিলেন নোয়াখালী বা চট্টগ্রামের, বা নিদেন পক্ষে শ্বশুরবাড়ী ছিলো ঐ অঞ্চলের, গিয়াস কামাল চৌধুরী, রিয়াজভাই, বা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রমুখ। এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে একবার রিয়াজভাই আমায় বললেন, ‘শিতাংশু, আপনার শ্বশুরবাড়ী কোথায়? বললাম, চট্টগ্রাম। হেসে তিনি বললেন, আপনার নেতা হওয়ার সম্ভবনা আছে? রিয়াজুদ্দিন আহমদ ভিন্ন শিবিরে ছিলেন, আমাদের মধ্যে ভিন্নতা ছিলো, তিক্ততা ছিলোনা। ক’দিন আগে ফটোগ্রাফার লুৎফুর রহমান বিনু চলে গেলেন, ভিন্নতা ছিলো, আমরা একসাথে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। এরআগে হাজী জহির, আরো অনেকেই যাচ্ছেন। তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, এটাই প্রকৃতির অলঙ্ঘনীয় নিয়ম।  ‘যেতে নাহি দেব..’?


রিয়াজভাই’র মৃত্যুতে বাণী হয়তো এসেছে, আমি দেখিনি। তাঁর সাথে যাঁরা সুদীর্ঘকাল একসাথে চলেছেন, ভিন্ন শিবির হলেও তাকে নিয়ে লেখা হউক। অর্ধ-শতাব্দী সাংবাদিকতা করে রিয়াজুদ্দিন আহমদ তাঁর বন্ধুদের কাছে এটুকু দাবি অবশ্যই করতে পারেন। রাজনৈতিক বিভাজনের পরেও সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত সহমর্মিতা থাকাটা বাঞ্চনীয়! দুই ফোরামে যাঁরা নেতা, তাঁরা কিছুটা বিচক্ষণতার সাথে তৎপর হলে অন্তত: প্রেসক্লাবে সকল পক্ষ এক টেবিলে বসে আগের মত আড্ডা দেয়া তো সম্ভব? ডিজিটাল আইন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, রিয়াজুদ্দিন আহমদ বিপক্ষীয় রাজনীতির সমর্থক হতেই পারেন, কিন্তু তিনি তো মিডিয়া ঘরানার মানুষ, তাইনা?

২৭ ডিসেম্বর ২০২১, নিউইয়র্ক।
dailykagojkolom.com এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।