মোখলেসুর রহমানের বোধসূত্রের বিভা

প্রায় তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন কবি ও কথাশিল্পী মোখলেসুর রহমান। তার লেখায় একটা গতি আছে। নদী আছে। ধর্ম আছে। ডান-বাম, অলি-আউলিয়া আছেন। আছে সুখ-দুঃখ, নৈরাশ্য-নৈর্ঋতসহ সুন্দর একটা ষড়ৈশ্বর্য সমুদ্র। মোখলেসুর রহমানের কবিতায় যেমন সাগর-গিরি-পাহাড় আছে। তেমন আছে জীবন ও জীবনের মানসিক যন্ত্রণা। এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজের দশদিক। আছে প্রেম-বিরহ। আধ্যাত্ম্যবাদ। সব মিলিয়ে আমরা বলবো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড রকম সোচ্চার হওয়া এক কবির নাম মোখলেসুর রহমান।

যদিও এ কথাও সত্য, কবি মোখলেসুর রহমান তার প্রতিবাদী সত্তা ধারণ করেও কখনো কখনো জৈষ্ঠ্যের খরতাপে মরুভ‚মির একটা বিরহী মাঠ হয়ে দাঁড়ান। তিনি পছন্দ করে প্রতারক সুঘ্রাণের বদলে মানুষকে ভালোবাসা বিলাতে। ভালোবাসা বিলাতে বিলাতে তিনি ফতুর হতে কোনো আপত্তি বোধ করেন না।

কবি মোখলেসুর রহমান কখনো বিশ্বমানবতা এবং তার স্বপ্নের সবুজ আত্মাকে, দেশপ্রেমকে একমঞ্চে এনে দাঁড় করাতে চান। আবার কখনো প্রতিরক্ষার সবুজ দেয়াল, ইগো সময়, সময়ের তসবিদানা, মধ্যরাতের আলোর বন্যা, বোধসূত্রের বিভা— ফিলিস্তিন, কাশ্মির, আফগান, রাবরি মসজিদ, ফারাক্কাবাঁধ, পদ্মার পানি ও সুন্দরবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করেন, পৃথিবীতে কবিতার মৃত্যুর আগে কোনো কবির মৃত্যু হবে না এবং তিনি এ কথাও বলেন—
‘আমার পিতার বিপন্ন সভ্যতার মানচিত্র…।
লুট হয়ে যাচ্ছে লজ্জা শরম হায়া
শেষাবধি লুট হয়েছে মায়া ও কায়া
লুট হয়েছে সবুজ বাতি ইমানের ছায়া।’

কবি তার ‘আলোর চাতালে পুড়ে যাও’ কবিতা দিয়ে আমাদের নিয়ে যান আমিত্ব ও জীবনের এক শুদ্ধতার ভেতর—
‘যে জন আমিকে পোড়াতে পারে আকাশের আলোয়
সেই তো পেয়ে যায় জীবনের শুদ্ধতা।
‘জেনে রাখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়’।

২.
কবি ও কথাশিল্পী মোখলেসুর রহমান প্রায়ই তার স্মৃতির আয়নায় দেখেন দরসে হাদিসের রুহানি পাখ-পাখালি, আকাশ-তারা। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সফেদ কাপড়ে মোড়ানো কোনো পবিত্র আর সবুজ বংশকূল। তিনি দীক্ষিত হন আধ্যাত্মিক ছায়ায় হুববে রাসুলের আদর্শে। কবি বলেন—
‘দীর্ঘকালের চক্রের ঘূর্ণায়নে দেখিলাম তাঁকে এক সুবর্ণ মুখ
সেদিন মসজিদ আন নূরে ছিলেন নিমগ্ন ধ্যানে— চেহারাপানে
আমিও ভাবি তাকে চেনা চেনা মনে হয়, চেয়ে থাকি মুখবদনে
কথায় কথায় চেনা হয়ে যায়। তিনি আমার আদর্শিক বড়ো ভাই
ভাবের বিনিময়ে, ভাবের মানুষ মুর্শিদ আমাদের এক ভাই।’

আধ্যাত্ম্য বা মানবপ্রেম, যে প্রেমের কথাই বলি না কেনো— পৃথিবীতে প্রেম-বিরহ প্রবল ঝড়-বাতাসে একটা খরকুটোর মতো মানুষকে কখন কোথায় নিয়ে যায় তা মানুষ নিজেও জানে না। মানুষ জানে না শীতের কুয়াশা ও ছলনাময়ী সমুদ্রের রূপ, রস ও গন্ধের কথা। এরাও এক সময় মানুষকে বিষাদের ছায়া অথবা রেডিও অ্যাকটিভ ছাইয়ে পরিণত করতে পারে। প্রেমের প্রবল জোয়ারকেও ভেঙে দ্যায় বোধসূত্রের বিভা।

কবিমাত্রই প্রেম বা বিরহে কাতর। আমাদের আজকের আলোচিত কবি মোখলেসুর রহমানও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে তিনি আগাপাছতলা ডুবে আছেন আধাত্ম্য প্রেমের জগতে। তিনি তার কাব্যগ্রন্থ ‘বোধসূত্রের বিভা’-তে লিখেছেন ভালোবাসা যার স্রোতে বয়ে যায় সুখ অবিরাম। কবি লিখেছেন—
‘ভালোবাসো ভালোবাসো তোমাকে আমাকে কাউকে
ছেলেমেয়ে, বউ— মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয় ও মানুষজন
ভালোবাসো ভালোবাসো স্রষ্টার দান হবে তারা আপনজন
প্রশংসিত কায়েনাতে ভালোবাসো আহমদকে যাবে না নরকে।’

আমরা আগেই বলেছি কবি মোখলেসুর রহমান প্রেম, আধ্যাত্ম্যবাদ এবং যন্ত্রণাকাতর এক দগ্ধ কবি। হতাশার চাদরে বোনা তার এই স্বপ্নের স্বদেশ। যেখানে তিনি মনের শাদা পাতা বিছিয়ে রেখেছিলেন। অথচ তার সবুজ স্বপ্নগুলো পুড়ে গেছে বারুদের পোড়া গন্ধে। তার সামনে পেছনে, দেশে-বিদেশে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ। হিংসা-হানাহানিতে ভরে গেছে দেশ। শুদ্ধ রাখতে গিয়েও কবি তার পৃথিবীটাকে শুদ্ধ রাখতে পারছেন না। কবির সামনে এক আতঙ্কিত জন্মভূমি। পোড়া পৃথিবী। জ্বলে যাচ্ছে মিয়ানমার, সোমালিয়া, ফিলিস্তিন, আফগান বা কাশ্মির। বিবেক বলতে পৃথিবীতে আর কিছু রইলো না। কবি মোখলেসুর রহমান তার ‘ঝুলে আছে সময়’ কবিতায় বলে ওঠেন—
‘সময় ঝুলে আছে বিকেলের আকাশে।
মানুষ কী জানে তার পরিযায়ী জীবন
পরিযায়ী পাখি জানে তার ঠিকানা।

তোমার সামনে ঝুলে আছে সময়
সময়ের বিভা, লোবান ও গন্ধ
শোনো ‘আল আসর! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।’

কবি মোখলেসুর রহমান তার এ কাব্যগ্রন্থখানি উৎসর্গ করেছেন আধ্যাত্মিক জগতের বর্তমান সময়ের মুর্শিদ আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী বড়ো সাহেবের বরকতময় হাতে। বইটি প্রকাশ করেছে ‘প্রতিভা প্রকাশ’। প্রচ্ছদ করেছেন সঞ্জিব রায়। প্রচ্ছদ বেশ নান্দনিক। প্রকাশক মঈন মুরসালিনকে সাধুবাদ না দিলেই নয়। তার গেটআপ-মেকআপে মুন্সিয়ানার ছাপ রয়েছে। কিছু বানান বিভ্রাট ছাড়া বইটি পাঠক মহলে বেশ সারা ফেলবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। চার ফর্মার এ বইটির দামও পাঠকের হাতের নাগালে— মাত্র একশত ষাট টাকা। আমরা কবি মোখলেসুর রহমানের এ বইটির বহুল প্রচার, প্রসার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি।

মোখলেসুর রহমান আমাদের বর্তমান সময়ের অন্য অনেক কবির চেয়ে বড়ো বেশি ফলবান অথবা লাউগডা সুখের মতোন একফালি সুখ— ‘বিশ্বস্ত গাছ, জীবন ও মানুষ’, ‘তুমি অণুজীব, তুমি চলে যাও’, ‘জ্ঞানের প্রদীপে তাকওয়ার আলো’, ‘ফিদায়ে রাসুল তাওয়াফের পথে’, ‘দিয়াশলাই,’ ‘স্বপ্নবাজ হৃদয়ের চোখে’, ‘মুক্তির সনদ লিখে যাও’সহ আরো অসংখ্য হৃদয়ছোঁয়া কবিতা আছে মোখলেসুর রহমানের এ গ্রন্থখানিতে। যা আমরা আরেক দিনের জন্য তুলে রাখলাম। এসব কবিতা নিয়ে আমরা আরেক দিন কথা বলবো। আজ শুধু এটুকুই বলতে চাই— মোখলেসুর রহমান একজন সামনের রৌদ্রে ভেজা, প্রজ্ঞার লবণ ও গহিন সমুদ্রে বৃষ্টির ফোঁটার মতোন ডুবসাঁতার দেয়া এক বিনম্র কবির নাম।

dailykagojkolom.com এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।