প্রসঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি : নাকে দুর্গন্ধ গেলে কি নাক কেটে ফেলতে হবে!

|| জাকারিয়া জাহাঙ্গীর ||

রাজধানী থেকে বেড়াতে যাওয়া নরসিংদী রেলস্টেশনে গত ১৮ মে (বুধবার) সকাল ১১টার দিকে এক তরুণী ‘অশালীন পোশাক’ পরার অপবাদে কয়েকজন নারী-পুরুষের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হন। ঘটনার পরদিন এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় নামে। ঘটনা যা হয়েছে মেনে নেওয়ার মতো না। প্রত্যেকেরই নিজস্ব স্বকীয়তা, চিন্তা ও সমালোচনার অধিকার এবং পোশাকের স্বাধীনতা আছে—যতক্ষণ না দেশের প্রচলিত আইনবিরোধী ও অন্যের অধিকার খর্ব করে। ওই তরুণীর ‘পোশাকে অশ্লীলতা’ যদি কারো ব্যক্তিগত আঘাত বা সামাজিক দৃষ্টিকটু হয়, সেক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিকার আছে। বিবেকবান ও সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না, এমনকি কোনো অন্যায়েও এমনটা আইনসিদ্ধ নয়। এরূপ করলে বরং আইন উল্টো তাকেই শাস্তির মুখোমুখি করবে। যেমনটা নরসিংদীর ঘটনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের সমাজে একটা ট্রাডিশন শুরু হয়েছে—কোনো ঘটনা ঘটলেই বিতর্কিত পদ্ধতিতে দৃষ্টিকটু প্রতিবাদ। যেমন পোশাকের জন্য তরুণী লাঞ্ছনার প্রতিবাদে ‘নিজেদের ইচ্ছেমতো পোশাক’ পরে ২৭ মে (শুক্রবার) নরসিংদী স্টেশনে গিয়েছিলেন ২০ জন রমণী। দু-একজন স্লিভলেস জামা পরে কিংবা উন্মুক্ত বক্ষ প্রদর্শন করে রাস্তায় নামলেই যদি প্রতিবাদ হয়, তাহলে তো এরচেয়ে বড় ধরণের নারী নির্যাতনের ঘটনায় নগ্ন হয়ে রাস্তায় না বেরোনো পর্যন্ত প্রতিবাদই হবে না!
গত ২ এপ্রিল রাজধানীর ফার্মগেটে তেজগাঁও কলেজের শিক্ষিকা লতা সমাদ্দারকে টিপ পরা নিয়ে একজন পুলিশ কনস্টেবল কটাক্ষ করায় কী কাণ্ডটাই না ঘটে গেছে! বিকৃত মগজের কিছু পুরুষও কপালে টিপ পরে ফেসবুকে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। শেষপর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন অভিযুক্ত ওই পুলিশ কনস্টেবল। কারো সাজ, পোশাক ও ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে কেউ বিরূপ মন্তব্য করতে পারেন না। কিন্তু সেসব অন্যকে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিশেষ কাউকে আঘাত করার কাজে ব্যবহার করার অধিকারও কারো নেই। এক টিপকাণ্ডে মুসলিম বিদ্বেষ প্রকাশ করে যে মাত্রায় প্রতিবাদ হয়েছে তা আদৌ কাম্য ছিলো না। কাম্য নয় পোশাক নিয়ে লাঞ্ছনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো বাড়াবাড়িও। নারী ও প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় না, এমন মানুষ খোঁজে পাওয়া দুষ্কর। নারীর পোশাকের চাকচিক্যতা, নারীর দেহ, টিপপরা মুখশ্রী মানেই আলাদা সৌন্দর্য। এসব নিয়ে সৃষ্টি হয় অগণিত গল্প-কবিতা-উপন্যাসের উপমা। তারমানে তো এই নয় যে, এই বিষয়গুলোর ওপরই থমকে দাঁড়াতে হবে সবকিছু ভুলে! দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত উর্ধগতিতে মানুষ যখন নাভিশ্বাসে, লোডশেডিং, গ্যাস সঙ্কট, যানজটসহ সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা অবনতি যখন তুঙ্গে—ঠিক এই সময়ে তুচ্ছ কিছু বিষয় নিয়ে ব্যস্ত পুরো রাষ্ট্র। আর অবলা সম্প্রদায় (!) টোপ গিলছে ক্ষুধার্ত মাছের মতো। ফলে সরকারও সফল—সামান্য কিছু ইস্যুতে বড় বড় ইস্যু ঢাকতে পারছে।
লতা সমাদ্দারের সাথে যেদিন টিপ নিয়ে ঘটনা; সেদিনই সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ব্রজেন্দ্রগঞ্জ আরসি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেবক রঞ্জন দাস দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে বোরকা পরা নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন। বোরকা পরে শ্রেণিকক্ষে বসে থাকায় ছাত্রীকে পর্নোস্টার মিয়া খলিফার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন ওই শিক্ষক। ওই ঘটনা নিয়ে দেশে টুঁ-শব্দটিও ছিলো না। বরং বিষয়টি তড়িঘড়ি করে স্থানীয়ভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়। ৬ এপ্রিল নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার দাউল বারবারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা আমোদিনী পাল অন্তত ১৮ জন ছাত্রীকে হিজাব পরে আসায় লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহত করেন বলে খবর বেরিয়েছিলো মিডিয়ায়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এটি সাজানো ও মিথ্যা উল্লেখ করে ঘটনা মাটিচাপা দিতে সমর্থ হন ওই শিক্ষিকা। মুলত উপরোক্ত ঘটনা দু’টির প্রতিবাদে কোনো নারীবাদীকে বিবৃতি দেখা যায়নি। যেভাবে টিপ পরে টিপের পক্ষে প্রতিবাদ হয়েছে, যেভাবে পোশাক নিয়ে লাঞ্ছনার প্রতিবাদে ছোটকাপড় পরে স্টেশনে প্রতিবাদ জানাতে গিয়েছিলেন কিছু নারী—সেভাবে কোনো পুরুষ বোরকা/হিজাব পরে তখন প্রতিবাদ করতে ফেসবুকে আসেননি।
শরীর যার স্বাধীনতা তার—এই স্বেচ্ছাচারিতা কোনো ধর্ম এবং কোনো রাষ্ট্রই অনুমোদন করে না। কারণ তা না হলে সামাজিকতা ও কোনো বিধিবিধানের প্রয়োজন ছিলো না। শালীনতা বজায় রেখে যে যার পছন্দমতো কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে পোশাক পরিধান, সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য সাজগোজ করতেই পারেন। কিন্তু একজনের বিশ্বাস অন্যজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ও একজনের পছন্দকে অন্যজন কটাক্ষ করার অধিকার রাখে না। সমাজের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী নারীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তাদের মধ্যে তথাকথিত কিছু নারীবাদী রয়েছেন, যারা নারীর অবাধ চলাফেরা ও হিজাবমুক্ত থাকতে পারাটাই নারীঅধিকার বলে মনে করেন। নারীর যদি পোশাকের স্বাধীনতা থাকে, তবে যিনি যে পোশাকই পরবেন, তাতে তো কেউ বাধা দিতে পারে না, কটাক্ষ করতে পারে না। কিন্তু কথিত নারীবাদীদের বাস্তব চরিত্র হিজাব ও নগ্নতার ক্ষেত্রে উল্টো দেখা যায়। নারীবাদীরা চায় কী! ওরা নারীর পোশাক/সাজসজ্জার স্বাধীনতা চায়, কিন্তু হিজাব/বোরকার বিরোধিতা করেন। হিজাব/বোরকা কি পোশাক না? যারা পর্দা করতে চান, তাদের এ স্বাধীনতা কেন থাকবে না? তথাকথিত নারীবাদ মানে কি নগ্নবাদ? পোশাকের স্বাধীনতা মানে কি নগ্নতা?
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কর্নাটকের একটি প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মুসকান খান হিজাব-বোরকা পরা নিয়ে যে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন—তার পোশাকের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেননি আমাদের নারীবাদীরা। জয় শ্রী রাম শ্লোগানে যারা মুসকানের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে, তাদেরকে প্রতিবাদ জানাতে দেখিনি। বরং হিজাব-বোরকার প্রতি বিষোদগার করে ‘জাত গেলো, জাত গেলো’ বলে ফেনা তোলেন প্রগতিশীলের ধ্বজাধারীরা। কিছুদিন আগে জাতীয় পরিচয়পত্রে ছবির পরিবর্তে বায়োমেট্রিক বা আঙ্গুলের ছাপ দেওয়ার দাবি জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন রাজারবাগ দরবার শরীফের মহিলা আনজুমানের নারীকর্মীরা। হিজাব-নিকাব পরিহিত অবস্থায় নারীদের সরকারি-বেসরকারী সেবা নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন করেছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও (ঢাবি) যেসব শিক্ষার্থী হিজাব-নিকাব ব্যবহার করতে চান তারা যেন তা নির্বিঘ্নে করতে পারেন, সেই দাবি জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন ‘প্রোটেস্ট এগেইনস্ট হিজাবোফোবিয়া’ নামের একটি সংগঠন। এসব দেখে নাক সিটকান অনেকেই। তা কেন হবে? টিপ বা ছোটকাপড় পরা নিয়ে লাঞ্ছনার প্রতিবাদে সারাদেশে নিন্দার ঝড় বইলেও, পর্দার পক্ষে কথা বলায় ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারীরা কেন কটাক্ষের মুখোমুখি হবেন? নারীকে ধর্ষণের পর বিবস্ত্র করে ভিডিওধারণ ও তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার অনেক ঘটনা দেশে আছে, কিন্ত সেসব ঘটনায় কেউ কি বিবস্ত্র হয়ে প্রতিবাদ জানান! ভারতের সীমান্তরক্ষী বিএসএফ বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানীকে যখন মেরে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখলো—কেউ কাঁটাতারে ঝুলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন! বরিশালের বাকেরগঞ্জে একটি দাখিল মাদরাসার সুপারিন্টেন্ডেন্টকে মাথায় মল ঢেলে নির্যাতন করা হয়েছিলো—তখন কি কেউ নিজের মাথায় মল ঢেলে প্রতিবাদ করেছিলেন! আদৌ কি তা সম্ভব!
আসলে চেতনার চাইতে ভণ্ডামিই বেশি দেখা যাচ্ছে সমাজে। নারীবাদীর পরিচয়ধারী কিছু বুদ্ধিজীবী পুরুষ নারীর অধিকারের নামে গলাবাজি করলেও নারীর বেলেল্লাপনা নিয়ে এবং সিনেমা-নাটক-বিজ্ঞাপনে অবাধ নারীদেহ প্রদর্শন নিয়ে কোনো কথা বলেন না তারা। বরং রঙিন জগতের লোভ দেখিয়ে ও কৌশলে নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে উপস্থাপন করছেন অবলীলায়। দিনের আলোতে যারা নারীর অধিকার নিয়ে চিৎকার করেন, রাতের গভীরে রঙিন আলোর ফোয়ারায় তাদেরই কেউ কেউ নারীর দেহ নিয়ে উৎসবে মেতে থাকেন। যাদের কাছে নারীর অধিকারের চাইতে নারীর দেহই প্রিয়, তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমাদের নষ্ট সমাজের—জাতির এরচেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে! সামাজিক অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতি নারী ধর্ষণ-ইভটিজিংয়ের অন্যতম ও প্রধানতম কারণ হলেও শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, পুরুষের রুচিবোধ বা দৃষ্টিভঙ্গিকেই দায়ী করা হয়। কারো নাকে দুর্গন্ধ গেলে কি নাক কেটে ফেলতে হবে নাকি দুর্গন্ধ দূর করতে হবে! কানে বিরক্তিকর শব্দ প্রবেশ করলে কান বন্ধ রাখতে হবে নাকি শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে! যারা কথায় কথায় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লেকচার শোনায়, তাদের এককেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখে অবাক এবং মর্মাহত না হয়ে পারি না। এদের পক্ষপাতিত্ব মনোভাব নিজেদের চরিত্র ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট। সামগ্রিকভাবে বিষয়গুলো নিয়ে চরম ধোঁয়াশা বিরাজমান। আসলে উদ্দেশ্য পোশাক নাকি অন্যকিছু—তা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। পানি ঘোলা করে কারা মাছ শিকারের অপচেষ্টায় লিপ্ত—রাষ্ট্রকে শীঘ্রই চিহ্নিত করতে হবে তাদের।
[লেখক: কবি, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক
উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক কাগজ কলম]
dailykagojkolom.com এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।