একটি শিশুর সুষ্ঠু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার কি নেই ?

খোলা আকাশের নীচে ফুটপাথে একটি দোকানের সামনে উদোম গায়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে একটি ফুটফুটে শিশু।  প্রথমে দেখে ভুল হতে পারে এটা কোনো শিশুর মৃতদেহ কিনা। না,তা নয় মোটেও। আসলে সে ঘুমন্ত একটি কন্যা শিশু। তার পাশ দিয়ে মানুষ হেটে যাচ্ছে। অদূরে আলাপরত অবস্থায় মানুষ দেখা যাচ্ছে।  এ শিশুটির প্রতি পথচারীদের কারো কোনো ভ্রক্ষেপ নেই। নেই এই ছোট্ট শিশুটির প্রতি দয়া মায়া স্নেহ মমতা। কেউ নেই তাকে দেখার জন্য, সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য, পরম মমতায় তার গায়ে একটা ছোট্ট কাপড় দিয়ে তার শরীর ঢেকে দেয়ার জন্য। মানবিক কারণে তার দিকে নজর দেয়ার জন্য কোথাও কেউ নেই। তার মা বাবা ভাই বোন হয়তবা আছে হয়তবা নেই।
এমনও হতে পারে তার মা বাবা ভাই বোনেরা খাদ্যের সন্ধানে ভিক্ষা করছে, অথবা ত্রাণের জন্যে লাইন ধরে অপেক্ষা করছে। প্রসঙ্গত সারা বিশ্ব এখন প্রাণঘাতী মহামারী করোনাভাইরাসে টালমাটাল। দলে দলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষ প্রতি সেকেন্ডে প্রতি মিনিটে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিনে আক্রান্ত হচ্ছে পাশাপাশি বাড়ছে মর্মান্তিক মৃত্যুর মিছিল। বাংলেদেশও নয় এর ব্যতিক্রম। গত ১৩ মারচ’২০ পর্যন্ত বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছে ৬২১ জন, সুস্থ হয়েছে ৩৯ জন আর দুঃখজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেছে ৩৪জন। কিন্ত বৈশ্বিক পরিস্থিতি অত্যান্ত ভয়ানক এবং ভয়ংকর যেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৭,৯৩,২২৪ জন এবং মৃত্যুবরণ করছে ১,১০, ০৫২ জন।

ছবি কি শুধু ছবি ! একটি জার্মান প্রবাদ আছে —-‘একটি ছবি এক হাজার শব্দের চেয়ে বেশী তথ্য দেয়। অর্থ্যাৎ ছবি কথা বলার চেয়ে বেশী বোধগম্য’।  আসলে ছবি কথা বলে, আবেগ, অনুভূতি, মমতার প্রকাশ ঘটায়, অন্যায়ের  প্রতিবাদ করে, অন্যায়কে আংগুল তুলে দেখিয়ে দেয়, ছবির ভাষা সাবলীল, দেশ কাল পাত্র ভাষার ঊর্ধ্বে, এখানে ভাষার কোনো বেড়াজাল নেই, দেশের সীমানা নেই, শান্তি, সমৃদ্ধি, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, উচ্চবিলাস, সাম্য, শোষণ, বঞ্চনা, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, ভালো কাজ, মন্দ কাজ, সেবা, সশ্রূষা ইত্যাদি ইত্যাদি প্রকাশ পায়। সমাজকে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা দেয়ার ক্ষেত্রে কথার ব্যবহারের চেয়ে একটা ছবি দিয়ে অনেক তথ্য আর বার্তা মানুষের কাছ পৌঁছানো যায় একথা স্বীকার করতেই হবে। পাশাপাশি একটি শিশু যখন পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয় তখন সে কেঁদে উঠে। এটা কি শুধু একটি শিশুর শুধুই কান্না ? শুধুই চিৎকার ? নাকি সে চিৎকার করে ভুমিষ্ট হওয়ার বার্তা সারা পৃথিবীকে জানান দিচ্ছে।  

জানান দিচ্ছে তার অধিকারের কথা, সুষ্ঠু সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার জন্য তাঁকে সুন্দর পরিবেশ দেয়ার কথা জানান দেয়া।  সে তার সুরক্ষা চায়। অন্ন বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা আর শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা চায়। এসব অধিকার পৃথিবীর কাছে, ব্যাক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ , জাতি ও রাষ্ট্রের কাছে তার জন্মগত অধিকার নয় কি!।“আমরা জানি, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি শিশু। তার মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি শিশু দরিদ্র। এই দরিদ্র শিশুদের মধ্যে রয়েছে শ্রমজীবী শিশু, গৃহকর্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, পথশিশু, বাল্যবিবাহের শিকার শিশু এবং চর, পাহাড় আর দুর্গম এলাকায় বসবাসরত শিশু” {সূত্রঃ প্র / আলো,১৭ মার্চ ২০১৯} ।

 জানা যায়, “জাতিসংঘের ১৯৩ টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৯১টি দেশে ’জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ’  অনুমোদন করেছে। আনন্দের বিষয় হচ্ছে প্রথম যে সব দেশ এই চুক্তি স্বাক্ষর ও অনুমোদন করে, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। এই সনদের ৫৪টি ধারায় শিশু কল্যাণ নিশ্চিত করাসহ সকল প্রকার শোষণ, বৈষম্য, অবহেলা এবং নির্যাতন থেকে তাদের রক্ষার বিবরণ রয়েছে। সনদে স্বীকৃত অধিকারের আওতায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু ও মা-বাবার সর্ম্পকে, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, নাগরিক অধিকার, শিশু শোষন এবং আইনের সাথে বিরোধ জড়িত শিশুসহ অনেক বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপত্তা, বিনোদন ও অন্যান্য অধিকারের ক্ষেত্রে বয়স, লিঙ্গগত, ধর্মীয়, জাতিগত, পেশাগত, সামাজিক, আঞ্চলিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নির্বিশেষে সকল শিশু ও কিশোর কিশোরীর জন্য মানসম্পন্ন প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের মাধ্যমে তাদের সর্বোত্তম উন্নয়ন ও বিকাশ নিশ্চিত করা হবে”।

বলা হয়ে থাকে আজকের শিশুরাই জাতির এবং আগামীর ভবিষ্যৎ। তারাই ভবিষ্যতে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু তাদেরকে ভবিষ্যতের কান্ডারী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের দায়িত্ব, কর্তব্য, মনোভাব, করণীয় সমূহ কি সে ব্যাপারে আমাদের ধারণা, কর্ম পরিকল্পনা, নীতিমালা ইত্যাদি বিষয়ে খুব একটা ওয়াকিবহাল নই। জানা যায়, বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে কাঠামোগত অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামাজিক চর্চায় শিশু অধিকারের বিষয়টি এখনো অনেকখানি উপেক্ষিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, “এখনো আমাদের দেশের  অধিকাংশের ধারণা, শিশুরা যেহেতু বয়সে ছোট, তাদের দাবি আদায়ের ক্ষমতা যেহেতু কম, তাদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কম, অন্নবস্ত্র সবকিছু পরিমাণে তাদের কম লাগে বলে তাদের অধিকারগুলোও বোধ হয় মর্যাদায় তুলনামূলক ছোট এবং তা বাস্তবায়নে তেমন কোনো জবাবদিহি নেই”। তাঁদের অভিমতএই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এবং তা দেশের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য অকল্যাণকর, অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত হবে। পাশাপাশি তা ভবিষ্যৎ সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্তরায় হয়ে উঠবে তাঁদের আশঙ্কা।  অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে মাতৃ জঠরে শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। গাড়িকে পথ করে না দেয়ার জন্য জনপ্রতিনিধি তাঁর নিরাপত্তার জন্য দেয়া পিস্তল দিয়ে শিশুকে নির্দ্বিধায় গুলি করে। 

জায়াগ জমি ও সম্পদ নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে শিশুদের ব্ল্যাকমেইল করা, অন্যকে ফাঁসানোর জন্য আপন সন্তানকে হত্যা খুন জখম করা হয়, সম্পদের লোভ লালসার জন্য অন্যের সন্তানকে জবাই করা হয়, বলি দেয়া তেমন কোনো বিষয় নয় বর্তমান সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয়ের এযুগে।  শিক্ষার সুযোগ, অন্ন বাসস্থানের চিকিৎসা সুযোগ থেকে তাঁদের জন্মগত অধিকার থকে বঞ্চিত করা  হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বরং শিশু ও নারী শিশুদের বলৎকার, যৌন নিপীড়ন, যৌন হয়রানী, ধর্ষণ আর খুন করা হয়। এমনকি শিশু এবং নারী শিশুরা স্কুল, মদ্রাসায়ও নিরাপদ নয় বরং কতিপয় শিক্ষক, মৌলভী ও কর্মচারীদের কাছে যৌন লালসার শিকার হচ্ছে। ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্বা বা কুমারী মা হয়ে পড়ছে যা খুব বেদনাদায়ক ও মর্মন্তুদ। দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মানবপাচারকারীরা নারী শিশু ও শিশুদের পাচার, বিক্রি আর অপহরণ করছে, বেশ্যাবৃত্তিতে নিয়োজিত করছে অভিভাবকদের অজান্তে বা লোভে ফেলে। পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, গরীব দুঃখী অসহায় শিশু ও নারী শিশুদের বিরাট একটা অংশ গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। এসব গৃহকর্মীদের অমানুষিক অমানবিক নিষ্ঠুর নির্মম মর্মন্তুদ পাশবিক নির্যাতন করা হয়।

যৌন নিপীড়ন যৌন হয়রানী আর ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত দু মুটো ভাত আর মোটা কাপড় আর আশ্রয়ের জন্য। অনেক সময় গৃহকর্তা, তাঁদের সন্তান বা স্বজনদের অত্যাচারের শিকার যৌন লালাসার শিকার হয়ে কত শিশু গৃহকর্মীকে আত্মাহুতি দিতে হয়। তাঁদেরকে হত্যা পর্যন্ত করা হয় যা সমাজের চোখের আড়ালে রয়ে যায়। অনেকে মান সম্মান আর ইজ্জতের ভয়ে, সমাজপতিদের অর্থ বিত্ত আর বাহুবলের ভয়ে মামলা মোকাদ্দমায় জড়াতে চায়না। অনেকে টাকার প্রলোভনে পড়ে বা ভয়ে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের রফা দফা করতে বাধ্য হয়।

জানা যায়, “বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ১৯২৪ সালে জেনেভায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘শিশু অধিকার’ ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৯ সালে জাতিসংঘে শিশু অধিকার সনদ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষর করে। সেই সনদের আলোকে একটি শিশুকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই শিশুর পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান আইনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ১৯৯০ সালে শিশু অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ সনদে (সিআরসি) স্বাক্ষর করার পর থেকে বাংলাদেশ শিশু অধিকার সুরক্ষায় অনেক উন্নতি করেছে। একই সাথে আরও অনেক কিছুই করা প্রয়োজন, কেননা শিশুদের একটি বড় অংশ এখনও অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে, যখন তারা স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, শিক্ষা, সহিংসতা থেকে সুরক্ষা পাচ্ছে না এবং একবিংশ শতাব্দীর অনেক নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে আইনকানুন ও নীতি প্রণয়নে দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে।
আমাদের শিশুনীতি, শিশু আইন, শিশুশ্রম নিরসন নীতি, গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পাচার প্রতিরোধসহ নানা বিষয়ে শিশুদের সুরক্ষামূলক আইন রয়েছে, যা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু এখানে লক্ষণীয় একটি দুর্বলতা হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয়ের জন্য দায়িত্বশীল কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বাংলাদেশে কর্মরত শিশু অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তরের দাবি জানিয়ে আসছে, যা জাতিসংঘ শিশু অধিকার কমিটিও সুপারিশ করেছে, কিন্তু তার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ে না। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুর ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন যে হারে বেড়েছে, তার প্রতিকারে অনেক আইনি বিধান থাকলেও এই ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য আমরা বেশি কিছু করতে পারছি না। এই সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের জাতীয়ভাবে কোনো সমন্বিত শিশু সুরক্ষা কাঠামো না থাকা”।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশের শিশুদের সুরক্ষা, অধিকার বাস্তবায়ন, মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা বিধান দেশ ও রষ্ট্রের নৈতিক এবং মানবিক দায়িত্ব। শিশুদের অধিকার এবং বেড়ে উঠার জন্য শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য রাষ্ট্রকে অবিলম্বে যথাযথ ব্যবস্থা এবং উদ্যোগ গ্রহণ সময়ের দাবী। সংশ্লিষ্ট সকলের মনে রাখা জরুরি আজকের শিশু জাতির সুন্দর ভবিষ্যতের কর্ণধার।

 

ধন্যবাদান্তে, 

মোহাম্মদ মন্‌জুরুল আলম চৌধুরী 

আরবান ভিলা। ২২ গুরা মিয়া চৌধুরী লেইন। দেওয়ান বাজার । চট্টগ্রাম — ৪০০০. তারিখঃ ২০ / ০৪ /২০২০। 
মোবাইলঃ ০১৮১৯৩১৫৮০৮
dailykagojkolom.com এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।