লক লাগানোর জায়গা নেই, কিন্তু লক ডাউন চলছে: রোহিঙ্গা

পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমারের নাগরিক। আমাদের দেশে আশ্রিত। জাতিসংঘের সাহায্যে তারা জীবন যাপন করে। তারা এক ধরনের পলিথিনের বানানো ঘরের মধ্যে বসবাস করে। একই ঘরের এদিক-ওদিক পর্দা টানিয়ে বেশ কয়েকজন পরিবারের সদস্য থাকে। তাদের ফুড আইটেম, non-food আইটেম খাবার সরবরাহ করা হয়। রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার দেওয়া হয়। রিফুজি রিলিফ নিয়মিত পেতেই আছে। ঘর অর্থাৎ শেড সেখানেই তারা ঘুমায়। পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে একরকম। ঘরের মধ্যে সর্বোচ্চ ঘনবসতি। সকাল থেকে দিন পর্যন্ত ত্রাণ ডিসট্রিবিউশন কেন্দ্রের সময় কাটে। তাদের মধ্যে মাঝি আছে পরিবারের সমস্যা দেখাশোনা করে। এক পরিবার আর এক পরিবারকে সহযোগিতা করে এমন পরিবারের সংখ্যা খুব কম। আচরণগতভাবে তারা অন্যের প্রতি তেমন সহনীয় নয়। নিজে নিজের স্বার্থের ব্যাপারে তারা অত্যন্ত সজাগ। নিজেদের মধ্যে মারামারি করতেও দ্বিধা করে না। কিন্তু সমষ্টিক স্বার্থে আরো সজাগ। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থী তিনজন করোনা। আক্রান্ত।রোহিঙ্গা এনজিওতে কাজ করেছেন এমন দুজন করোনা আক্রান্ত। এনজিও দুজন কর্মী চিকিৎসা গ্রহণ করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী তিনজনই চিকিৎসা গ্রহণ নিয়ে পায়তারা করে। কেউ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কেউ দোকানে বসার চেষ্টা করে। তাদের ভয় হচ্ছে অন্যান্য রোহিঙ্গারা জানলে মেরে ফেলবে। কারণ ক্যাম্পে ঘনবসতি।

সেখানে লকডাউন করার কোন পদ্ধতি নেই। পরিবারের লোকজন একসাথে একই ঘরে থাকে। একসাথে জোট বেঁধে এ দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে একসঙ্গে সমাজে বসবাস করছে। আশ্রিত এর বৃহত্তর স্বার্থে তারা এক। কিন্তু সংক্রমণ রোগের বিস্তার রোধে রোগীর প্রতি তেমন সহনীয়তা পরিলক্ষিত হয়নি। তাদের মধ্যে বেশ কিছু অংশ মাদক সন্ত্রাস চুরি-ডাকাতি অর্থাৎ টাকা ইনকামের চেষ্টায় লিপ্ত। মালয়েশিয়া পাচারের কথা বলে অনেকেই অনেকের নিকট হতে টাকা নেয়। অতি সম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থীর করণা আক্রান্ত হওয়ার কারণ আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টি থেকে যতটুকু বুঝতে পারি সেটি হলো বৈশ্বিক সংক্রমণ। মাদার অব হিউমিনিটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের যেমনি ভাবে আশ্রয় দিয়েছেন ঠিক তেমন ভাবেই তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।অধিকাংশ ই এদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেহায়েতই কম। ক্যাম্পে অনেক এনজিওর কাজকর্ম হয়। সেটাও অনেক সীমাবদ্ধ বর্তমানে। রোহিঙ্গারা বাইরে আড্ডা দেওয়া দুই মাস হল বন্ধ করেছেন। পুলিশ এবং অন্যান্য সংস্থা মিলে যত রকমের সহযোগিতা প্রদান করছেন। দেশীয় নাগরিকের সমান বৈকি অনেক সময় বেশি সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। আক্রান্ত একজনকে বলতে শোনা গেছে। আমার কোনো লক্ষণ নেই। আমি নিশ্চিন্তে আছি। কিন্তু আমাকে চিকিৎসা, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন নিয়ে যাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে চিন্তা করছে তাতে আমি খুব খুশি।

সে দোয়া করেছে বাংলাদেশের মানুষের জন্য করোনা না হয়। মজার ব্যাপার হলো তার দেশ নেই ,বাড়ি নেই ঘর নেই ,আছে চালার পলিথিন। এবং যেখানে আশ্রিত সেখানকার মানুষ বিশ্বের মহামারী রোগ থেকে বাঁচানোর জন্য যেভাবে তার জন্য চিন্তা করছে সে ততটা নিজের জন্য চিন্তা করছে না। রোহিঙ্গাদের আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত আইসোলেশন রাখার ব্যবস্থা আছে এবং সেটা করা হচ্ছে। ক্যাম্পে ঘনবসতিপূর্ণ রাস্তায় ঘোরাঘুরি কমেছে। আক্রান্ত একজন রোহিঙ্গার বক্তব্য হল। বাংলাদেশের মানুষের ঘর আছে বাড়ি আছে শিক্ষা আছে নাগরিকের সমস্ত অধিকার সমুন্নত আছে যার কোন কিছুই আমাদের নেই। বাংলাদেশ সরকারের করোনা নির্দেশনা আমরা যেমন মেনে চলছি বাংলাদেশের সবার মেনে চলা উচিত। কারণ এদেশের প্রতিটি নাগরিকের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আমরা যাযাবরের মত ।

আমরা যদি বেঁচে থাকতে চাই তাহলে সুপ্রতিষ্ঠিত এ সমস্ত নাগরিকের বেঁচে থাকার ইচ্ছা হওয়া উচিত আরো বেশি হবে। তাই চিন্তা করলাম। রোহিঙ্গাদের নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত। তারাই বুঝে দেশ, সরকার, জীবন বেঁচে থাকার ইচ্ছা। কিন্তু আমরা? আমরাও বুঝি! বেঁচে থাকার ইচ্ছা আর সাথে সাথে বাজার করার ইচ্ছা ও প্রকাশ করি এবং দেখাই। যেটা এই মুহূর্তে না করলেও পারি। একজন রোহিঙ্গার কথায় স্পষ্ট আমাদের জীবন কত উন্নত আর আমাদের সরকার আমাদের নিয়ে কত চিন্তিত। আসলে দাঁত আছে বলে আমরা বুঝছি না। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা কেউ জানে না। এখনো সময় আছে যাদের লকডাউন নেই, লকডাউন এর লক লাগানোর জায়গা নেই, তারা তা মেনে চলছে ।আর আমাদের সব থাকতেও আমরা সেটা মেনে চলতে পারছি না। হাতের পাশে পাশেই আশ্রিত জাতি। তারা বাঁচতে চায় আমাদের কাছে এসে।। আর আমাদের সব থাকতেও এলোমেলো !

সুমন/কাগজকলম

dailykagojkolom.com এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।